রাষ্ট্রের তৃতীয় গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি সাতবারের সংসদ সদস্য এ মানুষটি সংসদ পরিচালনায়ও একজন সফল মানুষ। সংসদের কার্যক্রমে এবং রাষ্ট্রের গণতান্ত্রিক কাঠামোতে ‘স্পিকার’ পদটি অত্যন্ত পবিত্র ও গুরুত্বপূর্ণ। নিরপেক্ষতা ও দায়িত্ববোধই একজন স্পিকারের মূল ভিত্তি। স্পিকারের নিরপেক্ষতা এবং দায়িত্ববোধই সংসদীয় গণতন্ত্রের প্রাণ। একজন স্পিকার কোনো নির্দিষ্ট দলের নন, বরং তিনি পুরো সংসদের অভিভাবক। দলমত নির্বিশেষে সবার অধিকার রক্ষা করা এবং আইনসভার পবিত্রতা বজায় রাখাই তাঁর মূল দায়িত্ব। স্পিকারকে সরকারি ও বিরোধী দলের মধ্যে নিরপেক্ষ ভারসাম্য বজায় রাখতে হয়। সংসদীয় গণতন্ত্রে স্পিকারের দায়িত্ব হলো সব সদস্যের অধিকার, মর্যাদা এবং কথা বলার সমান সুযোগ নিশ্চিত করা। আর এ কারণে নিরপেক্ষতা বজায় রাখার খাতিরে নিজ দলের দলীয় পদ থেকে তিনি পদত্যাগ করে দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন। সংসদকে জনগণের আশা-আকাঙ্ক্ষার প্রকৃত কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত করতে হলে স্পিকারের নিরপেক্ষতার কোনো বিকল্প নেই। আর সে কাজটি নিখুঁতভাবেই সম্পন্ন করছেন মেজর অবঃ হাফিজ। স্পিকার নির্বাচিত হওয়ার পর তিনি আর কোনো নির্দিষ্ট দলের বা মতাদর্শের প্রতিনিধিত্ব করেন না। সরকার ও বিরোধী দল—উভয়ের কাছেই তিনি সমান অভিভাবক হিসেবে কাজ করছেন।ব্যক্তিগত বা দলীয় স্বার্থের তোয়াক্কা না করে, সর্বদা জাতীয় স্বার্থ এবং সাংবিধানিক বিধিমালার সঠিক প্রয়োগ ও সুরক্ষা নিশ্চিত করছেন। নৈতিক ও প্রশাসনিক সব ক্ষেত্রে আপসহীন সততার পরিচয় দিয়ে সংসদকে জনগণের আস্থার প্রতীক হিসেবে টিকিয়ে রাখছেন। সংসদে উত্তপ্ত পরিস্থিতিতেও নিজের মেজাজ নিয়ন্ত্রণ করে এবং নিরপেক্ষ সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ দৃঢ়তা প্রদর্শন করছেন মেজর অবঃ হাফিজ।
জাতীয় সংসদে জুলাইয়ের চেতনায় শহীদ পরিবারদের প্রতি তার শ্রদ্ধা সম্মান অতুলনীয় হয়ে থাকবে। সংসদে সংরক্ষিত নারী আসনের এমপি রোকেয়া বেগম বক্তৃতা দিতে উঠছিলেন। উনার পরিচয় শুধু একজন সংসদ সদস্য না উনি জুলাইয়ের সর্বকনিষ্ঠ শহীদ জাবির ইব্রাহিমের মা। রোকেয়া বেগম যখন সংসদে দাঁড়িয়ে সন্তান হারানোর বেদনা, সেই রক্তাক্ত জুলাইয়ের স্মৃতি আর জুলাই সনদ বাস্তবায়নের দাবি তুলে ধরছিলেন, তখন পুরো সংসদজুড়ে নেমে এসেছিল এক নিস্তব্ধতা। এমন এক পরিবেশ, যেখানে রাজনৈতিক পরিচয়ের চেয়ে একজন মায়ের কান্না বড় হয়ে ওঠে। নিয়ম অনুযায়ী জবাব দেওয়ার জন্য মাইক্রোফোনের সামনে দাঁড়ালেন আইনমন্ত্রী। তিনি কথা শুরু করতে যাবেন, ঠিক তখনই স্পিকার মেজর হাফিজ এমন একটা কথা বললেন, পুরো অধিবেশনের সবচেয়ে শক্তিশালী বাক্য হয়ে থাকবে। তিনি আইনমন্ত্রীকে থামিয়ে দিয়ে বললেন মাননীয় আইনমন্ত্রী, এর আগে যিনি বক্তৃতা দিয়েছেন, তিনি একজন শহীদ মাতা, এটি খেয়াল করে বক্তব্য রাখবেন।”এক লাইনে তিনি সবাইকে মনে করিয়ে দিলেন৷ এটা শুধু রাজনৈতিক বিতর্ক না, এটা একজন মায়ের রক্তমাখা ইতিহাসের কথা।
একেই বলে নেতৃত্ব।
একেই বলে দায়িত্বশীলতা।
একেই বলে ক্ষমতার সঠিক ব্যবহার।
মেজর হাফিজ শুধু একজন স্পিকারের দায়িত্ব পালন করছেন না তিনি পুরো সংসদকে স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন যে কিছু পরিচয় দল-মতের ঊর্ধ্বে। কিছু ত্যাগের সামনে সবাইকে মাথা নত করতেই হয়।
জুলাইয়ের চেতনা মুখে আওড়ানোর বিষয় না। সেটা কীভাবে আচরণে, সিদ্ধান্তে আর দায়িত্ব পালনে ফুটিয়ে তুলতে হয়, তিনি তার বাস্তব উদাহারণ দেখিয়েছেন। আমি মাননীয় স্পিকার মহোদয়ের সার্বিক সাফল্য কামনা করছি।
নকিব তালুকদার
অস্ট্রিয়া ভিয়েনা।
১০.০৭.২৬
Leave a Reply